বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অন্য কোনো দেশের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে না বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী।
তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ। নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার বাংলাদেশের রয়েছে। একইভাবে প্রতিবেশী দেশগুলোরও একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ নীতির প্রতি সম্মান দেখানো উচিত।
ঢাকায় চলমান ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’-এর একটি অধিবেশনে আজ শুক্রবার এসব কথা বলেন ভারতের হাইকমিশনার। ‘পাওয়ার অ্যান্ড প্রুডেন্স: ম্যানেজিং গ্রেট-পাওয়ার কম্পিটিশন উইদাউট কনফ্লিক্ট’ শীর্ষক অধিবেশনে তিনি বক্তব্য দেন।
দিনেশ ত্রিবেদী বলেন, ‘ভারতের দিক থেকে আমরা মনে করি, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বাংলাদেশের অন্য দেশগুলোর সঙ্গে কী ধরনের সম্পর্ক রয়েছে, তার ওপর নির্ভর করে না।’
বাংলাদেশের নিরাপত্তাগত স্বার্থ সম্পর্কে দেশটি সচেতন উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাখে। জনগণ গণতান্ত্রিকভাবে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করেছে। ফলে বাংলাদেশ যে সিদ্ধান্তই নিক, সেটি বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্ত।
‘বাংলাদেশের কী করা উচিত, তা কাউকে বলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই,’ বলেন তিনি।
ত্রিবেদী বলেন, দুই দেশেরই নিজ নিজ জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষার অধিকার রয়েছে। দুর্যোগ বা নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জের সময় প্রতিবেশীদের একে অপরকে সহযোগিতা করা উচিত। পাশাপাশি একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ নীতির প্রতিও সম্মান দেখাতে হবে।
তিনি বলেন, ‘একই সময়ে কোনো প্রতিবেশীরই একে অপরের নীতিতে হস্তক্ষেপ করার কোনো কারণ নেই।’
অমীমাংসিত বিষয়ে সংলাপ অব্যাহত রাখার আহ্বান
দ্বিপক্ষীয় অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধানে অব্যাহত সংলাপের ওপর গুরুত্ব দেন ভারতের হাইকমিশনার। পানি, বাণিজ্য, সংস্কৃতি, খেলাধুলা, যোগাযোগ ও পরিবহনসহ বিভিন্ন বিষয়ে উপযুক্ত ফোরামের মাধ্যমে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ত্রিবেদী বলেন, ‘বিষয়গুলো লুকিয়ে রাখার কোনো অর্থ নেই এবং বিষয়গুলো নিয়ে কথা না বলারও কোনো অর্থ নেই।’
দ্বিপক্ষীয় সংলাপ অব্যাহত রাখতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আলোচনার অগ্রগতি ধীর হতে পারে, তবে প্রক্রিয়া থেমে যায়নি।
‘আমি আপনাদের নিশ্চয়তা দিতে পারি, প্রক্রিয়া থেমে নেই। প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে,’ বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বাস করুন, এর একটি সমাধান হতে হবে এবং একটি সমাধান হবেই।’
প্রতিবেশী দুই গণতান্ত্রিক দেশের মধ্যে মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক উল্লেখ করে ত্রিবেদী বলেন, এসব মতপার্থক্য নিরসনের ভিত্তি হতে হবে পারস্পরিক আস্থা।
তিনি বলেন, ‘বিষয়গুলোর সমাধান কেবল সংলাপ ও পরামর্শের মাধ্যমেই হতে পারে। আর সেই সংলাপের ভিত্তি হলো আস্থা।’
সম্পর্কের ভিত্তি গভীর সাংস্কৃতিক বন্ধন
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক শুধু লেনদেনভিত্তিক নয় বলেও মন্তব্য করেন ভারতের হাইকমিশনার। তাঁর মতে, দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি গভীর সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক বন্ধন।
ত্রিবেদী বলেন, ‘আমরা শুধু লেনদেনভিত্তিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাই না, এর পরিধি অনেক বিস্তৃত এবং এর মধ্যে সাংস্কৃতিক সম্পর্কও রয়েছে। এই সাংস্কৃতিক বন্ধনটি অত্যন্ত, অত্যন্ত দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত।’
পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসার কথা উল্লেখ করে তিনি দুই দেশের অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উদাহরণ হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা তুলে ধরেন।
দুই দেশের জনগণের মধ্যে শক্তিশালী যোগাযোগ ও সম্পর্ক ভবিষ্যতেও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে উল্লেখ করে ত্রিবেদী বলেন, ‘এটি টিকে থাকবে—এ বিষয়ে আমার পূর্ণ আস্থা রয়েছে।’
আলোচনায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) এএনএম মুনিরুজ্জামান, সাবেক ভারতীয় সেনা কমান্ডার অরুণ কুমার সাহনি, জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ক্যারল ক্রিস্টিন ফেয়ার এবং ইস্তাম্বুল মেট্রোপলিটন মিউনিসিপ্যালিটির পররাষ্ট্র সম্পর্কবিষয়ক উপদেষ্টা মুস্তাফা ওসমান তুরান অংশ নেন।
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাভিত্তিক ‘সিএনএসএলটিজি-বিএসএনএসএস-ডিভিএলপিএমএনটি’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারিস হাদ্রোভিচ অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন।
বাংলাদেশে তুরস্কের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুস্তাফা ওসমান তুরান বলেন, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের অর্থ শুধু মাঝামাঝি অবস্থানে বসে থাকা নয়।
অধিবেশনে ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা কীভাবে সামাল দেওয়া যায় এবং উত্তেজনা বাড়ার ঝুঁকি কীভাবে কমানো যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!