দারিদ্র্য, বর্ণবৈষম্য আর সামাজিক বাধা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার অঙ্গনে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠার গল্প নাভানেথেম পিল্লাইয়ের। দক্ষিণ আফ্রিকার এক দরিদ্র তামিল পরিবারে জন্ম নেওয়া এই আইনজ্ঞের জীবনসংগ্রাম তাঁকে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি দিয়েছে।
তবে ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার জয় এবং তা ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া নিয়ে তাঁর নাম নতুন করে আলোচনায় এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
প্রদত্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে তদন্ত এবং মানবাধিকার প্রশ্নে তাঁর অবস্থানের কারণে পিল্লাইয়ের নোবেলপ্রাপ্তি নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তবে এসব সাম্প্রতিক ঘটনার তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে এগিয়ে যাওয়া
নাভানেথেম পিল্লাই ১৯৪১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবার ছিল ভারতীয় বংশোদ্ভূত তামিল সম্প্রদায়ের। তাঁর বাবা বাসচালক ছিলেন। সাত ভাইবোনের পরিবারে দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে ওঠা পিল্লাইকে উচ্চশিক্ষার জন্য নানা বাধার মুখোমুখি হতে হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় সম্প্রদায়ের সহায়তা ও বৃত্তির মাধ্যমে তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান। পরে আইন বিষয়ে শিক্ষা নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় আইন পেশায় যুক্ত হন। বর্ণবৈষম্যের সময় একজন অশ্বেতাঙ্গ নারী হিসেবে তাঁকে পেশাগত ও সামাজিক বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই
দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনামলে মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে যুক্ত হন পিল্লাই। রাজনৈতিক বন্দীদের অধিকার রক্ষাসহ বিভিন্ন মানবাধিকার ইস্যুতে তাঁর ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়।
বর্ণবৈষম্যের অবসানের পর ১৯৯৫ সালে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান। দেশটির বিচার বিভাগে অশ্বেতাঙ্গ নারী হিসেবে তাঁর এই নিয়োগ ছিল উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
আন্তর্জাতিক বিচারাঙ্গনে ভূমিকা
পিল্লাই জাতিসংঘের রুয়ান্ডা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রুয়ান্ডার গণহত্যাসংক্রান্ত মামলায় যৌন সহিংসতাকে গণহত্যার হাতিয়ার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর বিচারিক ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচিত।
২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ছিলেন। এ সময় বিভিন্ন দেশে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন, সংঘাত ও বেসামরিক মানুষের সুরক্ষার প্রশ্নে তিনি সোচ্চার ছিলেন।
গাজা নিয়ে অবস্থান ও আন্তর্জাতিক বিতর্ক
গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে জাতিসংঘের তদন্ত এবং গণহত্যার অভিযোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। এসব বিষয়ে পিল্লাইয়ের সংশ্লিষ্টতার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা, ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এবং ইসরায়েলের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে প্রকাশিত দাবিগুলো নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে যাচাই ছাড়া নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়।
ন্যায়বিচারের প্রশ্নে দীর্ঘ পথচলা
দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যপূর্ণ সমাজে বেড়ে ওঠা থেকে শুরু করে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দায়িত্ব পালন—পিল্লাইয়ের কর্মজীবনের মূল বিষয় ছিল মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার।
তাঁর জীবনসংগ্রাম দেখায়, প্রতিকূল সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পেরিয়েও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব। তবে ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার দাবি এবং তাঁর বর্তমান বিচারিক দায়িত্বসংক্রান্ত তথ্য নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সেগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে প্রকাশ করা উচিত নয়।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!