জাতীয়

সাত মাসে ৩২ কূপ খনন, জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে প্রায় ১৪৮ এমএমসিএফ গ্যাস

আপডেট: অক্টো ০৮, ২০২৬ : ০৫:৩৫ এএম ২ ০
সাত মাসে ৩২ কূপ খনন, জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে প্রায় ১৪৮ এমএমসিএফ গ্যাস

দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমানোর উদ্যোগে গতি এসেছে। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত সাত মাসে ৩২টি কূপের খননকাজ শেষ হয়েছে। এসব কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ১৪৮ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফ) গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।

সরকার ২০৩১ সালের মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে ১৫০টি কূপ খননের লক্ষ্য নিয়েছে। এরপর ২০৩১ থেকে ২০৩৫ মেয়াদে আরও ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতাও কিছুটা কমবে।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত লক্ষ্যের অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে ৩২টি কূপ খনন শেষ হয়েছে। এর মধ্যে সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের (এসজিএফএল) ১৪টি, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) ১১টি এবং বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিএফসিএল) ৭টি কূপ রয়েছে।

৩২ কূপে গ্যাস ১৪৭ দশমিক ৯ এমএমসিএফ

এসজিএফএলের খনন করা কূপগুলোর মধ্যে রয়েছে বিয়ানীবাজার-১ ও ২, কৈলাশটিলা-১, ২, ৭ ও ৮, রশিদপুর-২, ৩, ৫ ও ১১, সিলেট-৭, ১০, ১১ এবং সিলেট-১০ এক্স।

বাপেক্সের ১১টি কূপ হলো টবগি-১, শ্রীকাইল নর্থ-১, শরীয়তপুর-১, ভোলা নর্থ-২, ইলিশা-১, সুন্দলপুর-৩, বেগমগঞ্জ-৪ ওয়েস্ট, জামালপুর-১, শ্রীকাইল-৫, সেমুতাং-৬ ও রূপগঞ্জ-১।

বিজিএফসিএলের কূপগুলো হলো তিতাস-১৪, ১৬, ২৪ ও ২৮, হবিগঞ্জ-৫, বাখরাবাদ-৭ এবং কামতা-২।

পেট্রোবাংলা জানায়, এসব কূপ থেকে দৈনিক ১৩৪ দশমিক ৪ এমএমসিএফ গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা ধরা হয়েছিল। তবে হবিগঞ্জ-৫ কূপে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি গ্যাস পাওয়ায় বর্তমানে ৩২টি কূপ থেকে প্রায় ১৪৭ দশমিক ৯ এমএমসিএফ গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।

তবে উৎপাদনের পুরো সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। পেট্রোবাংলার রিজার্ভার অ্যান্ড ডেটা ম্যানেজমেন্ট বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সম্পন্ন হওয়া কূপগুলো থেকে আরও প্রায় ৬০ এমএমসিএফ গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা থাকলেও পাইপলাইন-সংক্রান্ত জটিলতায় তা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

আরও সাত কূপের খনন চলছে

১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আরও সাতটি কূপের খননকাজ চলছে। এগুলো হলো রশিদপুর-১৩, সুন্দলপুর-১ ও ৪, তিতাস-২৯ ও ৩১, ভোলা নর্থ এবং বাখরাবাদ-৬।

পেট্রোবাংলার হিসাবে, এসব কূপের খননকাজ জানুয়ারির মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। কাজ শেষ হলে কূপগুলো থেকে দৈনিক প্রায় ৯৬ এমএমসিএফ গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে কূপ থেকে উৎপাদিত গ্যাসের পুরোটা জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যাবে কি না, তা পাইপলাইন ও প্রসেসিং প্ল্যান্টের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে।

৩১ কূপের আরও পরিকল্পনা

পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, বর্তমানে ১৯টি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন। আরও নয়টি প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এসব প্রকল্পের আওতায় ৩১টি কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। এর বাইরে পেট্রোবাংলার বোর্ডের মাধ্যমে আরও চারটি কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) লিড এনার্জি অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম বলেন, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা ভবিষ্যতে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)–এর ওপর নির্ভরতা কমাতে সহায়ক হতে পারে।

তাঁর মতে, শুধু দ্রুত গ্যাস উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, নতুন গ্যাস যাতে সময়মতো জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যায়, সেই অবকাঠামোও নিশ্চিত করতে হবে।

শফিকুল আলম বলেন, নতুন গ্যাসের মজুত শনাক্ত হওয়ার পর গ্রিডে সরবরাহের অবকাঠামোর অভাবে তা অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকা উচিত নয়। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে আগেভাগে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ বর্তমানে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে দৈনিক ঘাটতি ১ হাজার এমএমসিএফের বেশি।

সমুদ্রেও অনুসন্ধানে জোর

স্থলভাগের পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরেও গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিচ্ছে সরকার। সমুদ্রে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর কাছে ২৬টি অফশোর ব্লক উন্মুক্ত করে ‘বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড ২০২৬’ চালু করা হয়েছে।

এ ছাড়া নতুন কূপ খননের স্থান নির্ধারণে সার্ভে কার্যক্রম চলছে। প্রকল্প গ্রহণের আগে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সম্ভাবনাময় এলাকায় কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম

গ্যাস উৎপাদন বাড়লেও দেশে চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান এখনো বড়। বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ এমএমসিএফ। এর বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৬০০ এমএমসিএফ।

সরবরাহ করা গ্যাসের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৬০০ এমএমসিএফ দেশীয় উৎস থেকে এবং ৯০০ থেকে ১ হাজার এমএমসিএফ এলএনজি আমদানি করে পাওয়া যাচ্ছে।

দেশীয় উৎস থেকে পাওয়া গ্যাসের মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো দৈনিক প্রায় ৭০০ এমএমসিএফ সরবরাহ করছে। নতুন কূপ যুক্ত হওয়ায় এসব কোম্পানির সরবরাহ ৫৬৬ এমএমসিএফ থেকে বেড়ে প্রায় ৭০০ এমএমসিএফ হয়েছে। আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলো (আইওসি) থেকে পাওয়া যাচ্ছে আরও প্রায় ৯০০ এমএমসিএফ গ্যাস।

‘উৎপাদনের পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না’

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মান্নান বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়াতে নতুন কূপ খনন এবং বিদ্যমান কূপে ওয়ার্কওভার কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে ৩২টি কূপের কাজ শেষ হয়েছে এবং এসব কূপ থেকে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে।

তবে পাইপলাইন-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না বলে জানান তিনি।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান বলেন, আরও সাতটি কূপের খননকাজ চলছে। এগুলোর কাজ শেষ হলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি ১৯টি প্রকল্প চলমান এবং আরও নয়টি প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এসব প্রকল্পের আওতায় ৩১টি কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে।

দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে বলেও জানান তিনি।

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সঞ্চালন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামো উন্নয়নও জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি এবং এরপর ২০৩১ থেকে ২০৩৫ মেয়াদে আরও ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!