জাতীয়

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র: ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটে বদলাতে পারে অর্থনীতির চিত্র

আপডেট: অক্টো ১১, ২০২৬ : ০৫:৪০ এএম ৪ ০
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র: ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটে বদলাতে পারে অর্থনীতির চিত্র

দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন মাত্রা যোগ করতে যাচ্ছে পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর আগে গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ অতিক্রম হয়েছে। নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষার ফলাফল অনুমোদন করেছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। ফলে পরবর্তী পর্যায়ের কমিশনিং কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী কারিগরি পরীক্ষা ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত কার্যক্রম শেষ করা গেলে আগামী মাসে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে। তবে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু, টারবাইন চালু এবং জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ—প্রতিটি ধাপ আলাদা। তাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উৎপাদন শুরু করা নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা ও অনুমোদনের ওপর।

রূপপুরের দুটি ইউনিটের প্রতিটির উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এতে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস আরও বৈচিত্র্যময় হবে। একই সঙ্গে গ্যাস, কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

তবে এই বিদ্যুৎ দেশের অর্থনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে কেন্দ্রটির নিয়মিত উৎপাদন, বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থার সক্ষমতা, উৎপাদন ব্যয় এবং শিল্প ও অন্যান্য খাতে বিদ্যুতের চাহিদার ওপর।

প্রথম ইউনিটে কী অগ্রগতি

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে তাপ উৎপাদনের প্রক্রিয়া শুরুর পরিকল্পনা ছিল গত সেপ্টেম্বরে। কিন্তু নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষায় ত্রুটি ধরা পড়ায় কার্যক্রম পিছিয়ে যায়। পরে উচ্চ চাপে দুই দফা পরীক্ষা সম্পন্ন করে সংশ্লিষ্ট ফলাফল নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়। গত বৃহস্পতিবার পরীক্ষার ফলাফল অনুমোদন করা হয়েছে বলে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

পরীক্ষায় ভালভগুলো নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী কাজ করছে কি না, তা যাচাই করা হয়। পাশাপাশি অগ্নিনিরাপত্তা ও তেজস্ক্রিয়তাসংক্রান্ত নিরাপত্তাব্যবস্থাও পরীক্ষা করা হয়েছে।

এখন সামনে রয়েছে ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’ বা চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত ও স্বনির্ভর পারমাণবিক শৃঙ্খল বিক্রিয়া প্রতিষ্ঠার ধাপ। এ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর চুল্লির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও বিভিন্ন পরীক্ষা চালানো হবে। এরপর ধাপে ধাপে চুল্লির তাপ উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানো হবে।

প্রাথমিক পর্যায়ে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পরীক্ষামূলক উৎপাদন থেকে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদনে পৌঁছাতে আরও কয়েকটি কারিগরি ধাপ অতিক্রম করতে হবে।

অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে

রূপপুরের উৎপাদনক্ষমতা দেশের বিদ্যুৎ খাতে উল্লেখযোগ্য সংযোজন হতে পারে। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট দীর্ঘমেয়াদি হিসাব অনুযায়ী, দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চললে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হতে পারে। প্রকৃত অবদান অবশ্য নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট সময়ের চাহিদা, কেন্দ্রের উৎপাদন এবং রক্ষণাবেক্ষণের ওপর।

নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ শিল্পকারখানার উৎপাদন অব্যাহত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ সরবরাহে অনিশ্চয়তা কমলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন পরিকল্পনা সহজ হতে পারে। নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং কর্মসংস্থান তৈরির ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পারমাণবিক শক্তি উইংয়ের এক অতিরিক্ত সচিব বাসসকে বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও অর্থনীতির প্রচলিত অনেক হিসাব নতুনভাবে বিন্যস্ত হবে। ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি শিল্পকারখানার উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা বাড়লেই উৎপাদন ব্যয় কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কেন্দ্রটির নির্মাণ ব্যয়, ঋণের সুদ, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং বিদ্যুতের ক্রয়মূল্য—সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই অর্থনৈতিক সুফল মূল্যায়ন করতে হবে।

কী প্রযুক্তিতে তৈরি হচ্ছে রূপপুর

রাশিয়ার কারিগরি সহায়তায় নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহার করা হচ্ছে তৃতীয় প্রজন্মের ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তি। এর দুটি ইউনিটের প্রতিটির উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট।

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ইউরেনিয়ামের পরমাণুর বিভাজন বা নিউক্লিয়ার ফিশনের মাধ্যমে তাপ উৎপন্ন হয়। সেই তাপে পানি থেকে বাষ্প তৈরি করা হয়। বাষ্পের চাপে টারবাইন ঘোরে এবং টারবাইনের সঙ্গে যুক্ত জেনারেটর বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। প্রচলিত তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো কয়লা, তেল বা গ্যাস পুড়িয়ে এই তাপ তৈরি করতে হয় না।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রটির পরিকল্পিত আয়ুষ্কাল ৬০ বছর। প্রয়োজনীয় কারিগরি সংস্কার, নিরাপত্তা মূল্যায়ন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন সাপেক্ষে এ মেয়াদ আরও ২০ থেকে ৩০ বছর বাড়ানোর সুযোগ থাকতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনার জন্য কেন্দ্রটিতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা পরীক্ষা ও জ্বালানি পরিবর্তন করতে হবে। সাধারণ পরিচালন পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রায় দেড় বছর পরপর নতুন পারমাণবিক জ্বালানি দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। এ সময় সংশ্লিষ্ট ইউনিট নির্দিষ্ট মেয়াদে বন্ধ রাখতে হবে।

কয়েক দশকের পরিকল্পনার বাস্তবায়ন

রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ধারণা স্বাধীনতার পরপরই আলোচনায় আসে। ১৯৭৭ সালে ফরাসি প্রতিষ্ঠান সফরাটমের মাধ্যমে ১২৫ মেগাওয়াটের একটি কেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হলেও প্রকল্পটি তখন বাস্তবায়িত হয়নি।

পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সমীক্ষা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৯৬ সালের জাতীয় জ্বালানি নীতিতে পারমাণবিক শক্তিকে বিকল্প জ্বালানি উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০০৫ সালে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি এবং ২০০৭ সালে ৫০০ মেগাওয়াট করে দুটি ইউনিট স্থাপনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়।

পরে রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে বর্তমান প্রকল্পের কাঠামো নির্ধারণ করা হয়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকল্প এলাকায় পারমাণবিক জ্বালানি পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে কেন্দ্রটি কমিশনিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করে।

বিভিন্ন সরকারের সময়ে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ অব্যাহত ছিল। বিএনপির ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারেও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রতিশ্রুতি ছিল। ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারেও শান্তিপূর্ণভাবে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার অব্যাহত রাখার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও নিরাপত্তার প্রশ্ন

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পারমাণবিক শক্তি উইংয়ের যুগ্ম সচিব শেখ মুহম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বাসসকে বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নেরও বড় সুযোগ।

তিনি জানান, প্রথম ইউনিট উৎপাদনের প্রস্তুতির চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিটের ইউরেনিয়ামও প্রকল্প এলাকায় পৌঁছেছে। নির্ধারিত সময়সীমার আগেই কাজ শেষ করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহের মাধ্যমে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক মানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পারমাণবিক প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কাজ করছে।

রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়নে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি করপোরেশন রোসাটম কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে। প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পারমাণবিক শক্তি উইং।

দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা এখন বাস্তব উৎপাদনের কাছাকাছি পৌঁছালেও রূপপুরের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে নিরাপদ পরিচালনা, নিয়মিত বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর। ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের এই সক্ষমতা দেশের বিদ্যুৎ খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। সেই সম্ভাবনাকে টেকসই অর্থনৈতিক সুফলে রূপ দেওয়াই হবে পরবর্তী চ্যালেঞ্জ।


আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!