রাঙ্গামাটির কাপ্তাইয়ে দেশের প্রথম জাতীয় গ্রিড-সংযুক্ত সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে এ পর্যন্ত ৬ কোটি ৩৭ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়েছে। এর বাণিজ্যিক মূল্য প্রায় ৭৪ কোটি টাকা।
একসময় অব্যবহৃত পড়ে থাকা পাহাড়ের জমিতে গড়ে ওঠা এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে সেখানে আরও দুটি প্রকল্পের কাজ চলছে।
কাপ্তাই কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) এসব তথ্য জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেল, গ্যাস বা কয়লার প্রয়োজন হয় না। ফলে প্রচলিত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানি ব্যয় সাশ্রয় ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর সুযোগ রয়েছে।
পরিত্যক্ত জমিতে সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র
১৯৬২ সালে কাপ্তাই কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পর বাঁধের পাশে প্রায় ২২ একর জমি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে ছিল। ওই জমির ১৯ একরে প্রায় ১১১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় ৭ দশমিক ৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। ২০১৯ সালে কেন্দ্রটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়।
কেন্দ্রটিতে সারি সারি সৌর প্যানেলের মাধ্যমে সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। এতে অব্যবহৃত জমির ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন জ্বালানির একটি উৎস তৈরি হয়েছে।
কাপ্তাই সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, কেন্দ্রটি পরিচালনায় জনবল ও ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম। মূলত সৌর প্যানেল পরিষ্কার রাখা ও প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। আবহাওয়া খারাপ থাকলে উৎপাদন কিছুটা কমে যায়, তবে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ থাকে না।
তাঁর মতে, পাহাড়ের অব্যবহৃত জমিতে এ ধরনের প্রকল্পের পরিধি বাড়ানো গেলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
বাড়ছে উৎপাদন সক্ষমতা
বর্তমান সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে আরও ১ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে। পাশাপাশি নতুন করে ৭ দশমিক ৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার আরেকটি সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মাহমুদ হাসান জানান, কেন্দ্রটির সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ব্রিকফিল্ড এলাকায় নতুন সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রক্রিয়াও এগিয়েছে। প্রকল্পটির দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।
নতুন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে কাপ্তাইয়ে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা আরও বাড়বে। এতে জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
পাহাড়ে সৌর বিদ্যুতের সম্ভাবনা
বাংলাদেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় এক-দশমাংশজুড়ে রয়েছে তিন পার্বত্য জেলা—রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান। এসব অঞ্চলের উপযুক্ত অনাবাদি ও অব্যবহৃত জমি পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো গেলে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বড় সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, ভবনের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন, কৃষিভিত্তিক সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং সোলার পার্ক নির্মাণেও বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। তবে পাহাড়ি জমির পরিবেশগত গুরুত্ব, ভূমির ব্যবহার, বন সংরক্ষণ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ বিবেচনায় রেখেই এসব প্রকল্প পরিকল্পনা করা জরুরি।
বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি আমদানির ব্যয় ও সরবরাহের অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কাপ্তাইয়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে উপযুক্ত স্থানে সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প সম্প্রসারণ করা গেলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনেও অবদান রাখা সম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত বিনিয়োগ, উপযুক্ত প্রযুক্তি ও সরকারি সহায়তা।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!