দেশে ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে নতুন প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সরকার। এ জন্য মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণ, আইন প্রয়োগ জোরদার, নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা এবং জেলেদের সহায়তা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পে নিষেধাজ্ঞার সময় অবৈধ মাছ ধরা বন্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ও জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক কারণে ইলিশের উৎপাদনে ওঠানামা হতে পারে। তবে সরকারের নতুন উদ্যোগের ফলে আগামী বছরগুলোতে উৎপাদন বাড়বে বলে তাঁরা আশা করছেন।
মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ সম্পদ ব্যবস্থাপনা শাখার উপপরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ বাসসকে বলেন, ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের’ মেয়াদ শেষ হয়েছে। নতুন করে ‘মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণের মাধ্যমে ইলিশের টেকসই উন্নয়ন প্রকল্প’ প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদিত হলে শিগগিরই কাজ শুরু হবে।
তিনি জানান, নতুন প্রকল্পে ভিজিএফ সুবিধাভোগী জেলের সংখ্যা ৬ লাখ ২০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৬ লাখ ৪৬ হাজার করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। চলতি বছরও ইলিশ আহরণ কমের দিকে থাকলেও সরকারি উদ্যোগের কারণে ভবিষ্যতে উৎপাদন বাড়তে পারে বলে তিনি আশাবাদী।
উৎপাদন কমার পেছনে একাধিক কারণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে কোনো একক কারণ দায়ী নয়। জাটকা নিধন, প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ধরা, ছোট ফাঁসের জাল ব্যবহার, নদীর নাব্যতা হ্রাস, পানিদূষণ, পানিপ্রবাহের পরিবর্তন, অপরিকল্পিত অবকাঠামো এবং সমুদ্রে অতিরিক্ত মাছ ধরার চাপ—সব মিলিয়ে ইলিশের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের ফিশিং অ্যান্ড পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মাসুদ রানা বাসসকে বলেন, দেশের মোট মাছ উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৫ লাখ ২৯ হাজার টন। এর আনুমানিক বাজারমূল্য ছিল ২০ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন কমে প্রায় ৫ লাখ টনে দাঁড়ায়, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৫ দশমিক ৫ শতাংশ কম।
তাঁর মতে, ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষার পাশাপাশি নদীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নিয়মিত টহল ও অভিযান চালাতে হবে। নদীতে বর্জ্য ফেলা, পানিদূষণ, নাব্যতা সংকট এবং অন্যান্য মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করাও জরুরি।
ড. মাসুদ রানা বলেন, কোথায় ও কখন ইলিশ বেশি ডিম ছাড়ে এবং পরিবেশের কোন পরিবর্তন প্রজননে প্রভাব ফেলে, তা গবেষণার মাধ্যমে নির্ধারণ করে ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা করতে হবে। স্যাটেলাইট, জিআইএস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ড্রোন ও আধুনিক সেন্সর ব্যবহার করে ইলিশের বিচরণ ও প্রজননক্ষেত্র চিহ্নিত করা এবং অবৈধ আহরণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
মা ইলিশ ও জাটকা রক্ষায় জোর
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বাসসকে বলেন, ইলিশ রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, সবার। সম্মিলিতভাবে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করা গেলে ইলিশের উৎপাদন বাড়বে এবং জেলেরা দীর্ঘ মেয়াদে এর সুফল পাবেন।
তিনি বলেন, ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ ও ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য। ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন বাড়াতে সরকার ঘোষিত ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। এ সময়ে যেকোনো মূল্যে ইলিশ ধরা বন্ধ রাখতে হবে।
বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক মৎস্য ও অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের অধ্যাপক মো. আব্দুল ওহাব বলেন, দেশে গত দুই বছর ধরে ইলিশের উৎপাদন কমছে। ২০১৬ সালে উৎপাদন ৩ লাখ ৯৬ হাজার টনে পৌঁছানোর পর কয়েক বছর ধরে তা বেড়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে উৎপাদন নিম্নমুখী।
তাঁর মতে, দেশে বছরে সাড়ে ৫ লাখ থেকে ৬ লাখ টন ইলিশ আহরণ করা গেলে তা টেকসই উৎপাদনের সীমার মধ্যে থাকবে। উৎপাদন কমার বড় কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ধরা এবং নির্বিচারে জাটকা নিধন।
অধ্যাপক আব্দুল ওহাব বলেন, অতীতে ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে ২২ দিন মা ইলিশ রক্ষা, আট মাস জাটকা ধরা নিষিদ্ধ রাখা, মার্চ ও এপ্রিলে অভয়াশ্রমে মাছ ধরা বন্ধ রাখা এবং নির্দিষ্ট মাপের চেয়ে ছোট ফাঁসের জাল নিষিদ্ধ করার মতো পদক্ষেপ কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল। পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেদের খাদ্যসহায়তাও দেওয়া হয়েছিল। এখন অভয়াশ্রমগুলোর কার্যকারিতা পর্যালোচনা ও সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
নদীর পরিবেশ ও খাদ্যশৃঙ্খল রক্ষার তাগিদ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে নদী ও মোহনার স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বজায় রাখা, প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র সংরক্ষণ এবং উপকূলীয় পরিবেশের সুরক্ষা জরুরি। ভারতের গুজরাটের নর্মদা নদীর মোহনা ও ভরুচ অঞ্চলে ইলিশ উৎপাদনের পরিবর্তন নিয়েও তুলনামূলক গবেষণার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।
ড. মাসুদ রানার মতে, অতিবৃষ্টির ফলে নর্মদা নদীতে মিঠাপানির প্রবাহ বৃদ্ধি এবং মোহনা অঞ্চলে লবণাক্ততার পরিবর্তন ইলিশের চলাচলের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের পদ্মা, মেঘনা, তেঁতুলিয়া ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নদী অববাহিকার পরিবেশের সঙ্গে গুজরাটের পরিস্থিতি তুলনা করে গবেষণা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ইলিশের খাদ্যতালিকায় ২৭ প্রজাতির উদ্ভিদকণা ও ১২ প্রজাতির প্রাণিকণা রয়েছে। গবেষণায় মেঘনা নদীতে এসব প্ল্যাংকটনের পরিমাণ ৬৮ শতাংশ কমে যাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। নদীদূষণের কারণে ইলিশের প্রয়োজনীয় খাদ্য কমে যাওয়ায় মাছের আকৃতিতেও প্রভাব পড়ছে বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন।
জীবিকার সঙ্গে সংরক্ষণের সমন্বয় জরুরি
ইলিশ শুধু জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ নয়, উপকূলীয় জেলে ও মৎস্যনির্ভর জনগোষ্ঠীর জীবিকারও বড় উৎস। বর্তমানে প্রায় ছয় লাখ মানুষ সরাসরি ইলিশ আহরণের সঙ্গে যুক্ত। পরিবহন, বাজারজাতকরণ, জাল ও নৌকা তৈরি, বরফ উৎপাদন এবং মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন কাজে আরও প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার পাশাপাশি জেলেদের জীবিকা ও সংরক্ষণ কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। জাটকা নিধন বন্ধ, মা ইলিশের প্রজনন নিশ্চিত করা, নদীর বাস্তুতন্ত্র রক্ষা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে দীর্ঘ মেয়াদে ইলিশের উৎপাদন ও প্রাকৃতিক মজুত সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিঠাপানির মাছ আহরণে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় এবং চাষের মাছ উৎপাদনে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ ইলিশ আহরণেও বিশ্বে প্রথম। ২০১৭ সালের ১৭ আগস্ট ইলিশ বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!