খাদ্যে ভেজাল ও অনিয়ম ঠেকাতে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আট মাসে সারা দেশে ৭৪৪টি মোবাইল কোর্ট ও অভিযান পরিচালনা করেছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)। এসব অভিযানে ২ কোটি ৮৩ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন অপরাধে সাতজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি খাদ্যস্থাপনা তদারকি, খাদ্যপণ্যের নমুনা পরীক্ষা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে সংস্থাটি। বিএফএসএর মাসভিত্তিক পরিসংখ্যান থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে প্রধান কার্যালয়ের উদ্যোগে আটটি মোবাইল কোর্ট ও অভিযান পরিচালনা করে ছয় লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। মার্চে প্রধান কার্যালয়ের ছয়টি অভিযানে চার লাখ টাকা এবং জেলা ও মেট্রোপলিটন কার্যালয়ের ৭৭টি অভিযানে ৩৬ লাখ ১০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। ওই মাসে একজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এপ্রিলে প্রধান কার্যালয়ের ১৩টি অভিযানে তিন লাখ টাকা এবং জেলা ও মেট্রোপলিটন কার্যালয়ের ৭৬টি অভিযানে আট লাখ ৭০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। মে মাসে প্রধান কার্যালয়ের ১১টি অভিযানে ছয় লাখ টাকা এবং জেলা ও মেট্রোপলিটন কার্যালয়ের ৭৪টি অভিযানে ১৬ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। এ মাসে তিনজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
জুনে প্রধান কার্যালয়ের ১২টি অভিযানে চার লাখ টাকা এবং জেলা ও মেট্রোপলিটন কার্যালয়ের ৭২টি অভিযানে ১৫ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। এ মাসে একজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। জুলাইয়ে প্রধান কার্যালয়ের ১৫টি অভিযানে ছয় লাখ টাকা এবং জেলা ও মেট্রোপলিটন কার্যালয়ের ১০৪টি অভিযানে ৪২ লাখ ২৬ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। এ মাসেও একজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
আগস্টে অভিযানের সংখ্যা বাড়ে। এ মাসে প্রধান কার্যালয়ের ২৫টি অভিযানে ১০ লাখ টাকা এবং জেলা ও মেট্রোপলিটন কার্যালয়ের ১৭২টি অভিযানে ৭৫ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। সেপ্টেম্বরে প্রধান কার্যালয়ের ২৩টি অভিযানে ১২ লাখ টাকা এবং জেলা ও মেট্রোপলিটন কার্যালয়ের ৫৬টি অভিযানে ৩৯ লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। এ মাসে একজনকে কারাদণ্ড দেওয়ার তথ্য রয়েছে।
খাদ্যস্থাপনায় নানা অনিয়ম
বিএফএসএর অভিযানে রাজধানীর বিভিন্ন খাদ্যপ্রতিষ্ঠানে অনিবন্ধিতভাবে ব্যবসা পরিচালনা, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাবার তৈরি, লেবেলবিহীন মাছ-মাংস ও অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী সংরক্ষণের মতো অনিয়ম শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া খাদ্যকর্মীদের স্বাস্থ্যসনদ এবং পেস্ট কন্ট্রোলের প্রমাণক না থাকার বিষয়টিও ধরা পড়ে।
ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় অভিযানে পায়ে মাড়িয়ে চানাচুর তৈরি, পোড়াতেল ব্যবহার, অননুমোদিত রাসায়নিক রং প্রয়োগ, উৎপাদনস্থলে তেলাপোকা ও ছারপোকার উপস্থিতি, অনুমোদনহীন ঘি ব্যবহার এবং নোংরা পরিবেশে খাদ্য উৎপাদনের মতো অনিয়ম পাওয়া যায়। এসব ঘটনায় জরিমানা ও মামলা করা হয়েছে।
বিএফএসএর সদস্য (আইন ও নীতি) এবং চেয়ারম্যানের চলতি দায়িত্বে থাকা মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে চলমান কার্যক্রম আরও জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে। জেলা পর্যায় থেকে দেশব্যাপী অভিযান ও তদারকি বাড়াতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও সহায়তার বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, শুধু আইন প্রয়োগ নয়, খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিপণনের প্রতিটি পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। খাদ্যের মূল উপাদানের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করা এবং অবৈধ রং, গন্ধ ও ক্ষতিকর অ্যাডিটিভের ব্যবহার বন্ধে গবেষণা ও কারিগরি কার্যক্রমও চলছে।
খাদ্যস্থাপনা তদারকি ও নমুনা পরীক্ষা
বিএফএসএর তথ্য অনুযায়ী, গত আট মাসে ১ হাজার ৩০৭টি খাদ্যস্থাপনায় তদারকি করা হয়েছে। বাজার, হোটেল-রেস্তোরাঁ, বেকারি, মিষ্টির দোকান এবং খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানে এসব কার্যক্রম চালানো হয়। খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবেশন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনে নিরাপদ খাদ্যবিধি অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা হয়।
একই সময়ে ১ হাজার ২১০টি খাদ্য নমুনা পরীক্ষা করেছে কর্তৃপক্ষ। বোতলজাত পানি, ভোজ্যতেল, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য, দই, গুঁড়া মসলা, শিশুখাদ্য ও বেকারি পণ্যসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য এ পরীক্ষার আওতায় আসে।
নিরাপদ খাদ্য বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে বাংলাদেশ টেলিভিশনে সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন ও স্ক্রলবার্তা, বাংলাদেশ বেতারে অডিওবার্তা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি, রিলস ও ভিডিও প্রচার করা হচ্ছে। এসব প্রচারে নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ, স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে খাদ্য উৎপাদন ও বিপণন এবং ভোক্তাদের করণীয় তুলে ধরা হচ্ছে।
আইনে কী শাস্তির বিধান
নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ অনুযায়ী, অপরাধের ধরন ও মাত্রাভেদে অর্থদণ্ড ও কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। আইনে সর্বনিম্ন এক লাখ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানা এবং ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০১৩ সালে আইনটি প্রণয়ন করা হয়। ২০১৫ সালে গঠন করা হয় বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ।
কর্তৃপক্ষের মতে, অভিযান ও তদারকির পাশাপাশি খাদ্য পরীক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ভবিষ্যতে জেলা পর্যায় থেকে দেশব্যাপী এসব কার্যক্রম আরও জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!