বায়ুদূষণ শুধু মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ক্ষতি করছে না, বাধাগ্রস্ত করছে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারও। কয়লা ও তেল পোড়ানোর ধোঁয়া, ধুলাবালু এবং বর্জ্য পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট দূষণ সৌরবিদ্যুতের প্যানেলে জমে এর কার্যকারিতা কমিয়ে দিচ্ছে।
এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একদিকে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে বায়ুদূষণ সেই উদ্যোগের সুফল সীমিত করছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজন কার্যকর নজরদারি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়।
গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে ‘বায়ুদূষণ রোধে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, এখনই’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন বক্তারা। ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি, এখনই’ (Renewables Now) প্রচারাভিযানের অংশ হিসেবে সভাটির আয়োজন করা হয়।
ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা), স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশসহ ৩৭টি নাগরিক ও সামাজিক সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত সভায় বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো এবং পরিচ্ছন্ন ও টেকসই জ্বালানিব্যবস্থা গড়ে তোলার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন ও সঞ্চালনা করেন স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার। এতে সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান ডা. মোসা. মাহমুদা পারভিন। প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক শরিফ নাফে আস-সাবের।
দূষণে বাধাগ্রস্ত সৌরবিদ্যুৎ
অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, বায়ুদূষণ জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হওয়ার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারেও সরাসরি বাধা সৃষ্টি করছে। জীবাশ্ম জ্বালানি, বিশেষ করে কয়লা ও জ্বালানি তেল পোড়ানোর ফলে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া সূক্ষ্ম ধূলিকণা ও দূষক সৌর প্যানেলের ওপর জমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
তিনি বলেন, কার্বন নিঃসরণ কমাতে সৌরবিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু বায়ুদূষণের কারণে সেই প্রযুক্তির কার্যকারিতা কমে গেলে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে বাড়ে প্যানেল পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক মোহাম্মদ জিয়াউল হকও বলেন, ধুলাদূষণের কারণে সৌর প্যানেলের কার্যকারিতা কমে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ক্ষতি হতে পারে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে পরিকল্পনা ও সম্ভাবনা থাকলেও সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের (সিথ্রিইআর) উপপরিচালক রাউফা খানম বলেন, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি এর সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। বর্জ্য পোড়ানোসহ বিভিন্ন উৎসের দূষণ সৌরবিদ্যুৎব্যবস্থার কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এ জন্য স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সচেতন করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
জীবনযাত্রার মানের পাশাপাশি জীবনের গুণগত মান
এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক এ টি এম নুরুল আমিন বলেন, শুধু জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন নয়, জীবনের গুণগত মান নিশ্চিত করার দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। গাছপালা, নদী, পানি ও নির্মল প্রকৃতি মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য।
তিনি বলেন, বায়ুদূষণ কমাতে মানুষের আচরণগত পরিবর্তনের পাশাপাশি পরিকল্পিত নগরায়ণ প্রয়োজন। কর্মস্থল ও আবাসস্থলের দূরত্ব কমানো গেলে ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরতা কমতে পারে। এতে যানবাহন থেকে সৃষ্ট দূষণ কমানোরও সুযোগ তৈরি হবে।
দেশীয় প্রযুক্তি ও কার্যকর বাস্তবায়নের তাগিদ
স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক শরিফ নাফে আস-সাবের বলেন, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রথমেই সমস্যার ধরন ও উৎস চিহ্নিত করতে হবে। দেশীয় প্রযুক্তিকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি বিদেশি প্রযুক্তির সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।
তিনি বলেন, সমস্যাটি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি হলে দূষণের কারণ বোঝা এবং দেশের জন্য কার্যকর সমাধান বেছে নেওয়া সহজ হবে।
সভাপতির বক্তব্যে ডা. মোসা. মাহমুদা পারভিন বলেন, বায়ুদূষণ এখন আর কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও বড় হুমকি। টেকসই উন্নয়ন ও সবুজ শিল্পায়নের মাধ্যমে এ সংকট মোকাবিলা করতে হবে।
সভায় বক্তারা বায়ুর মান উন্নয়নে দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, জনসচেতনতা তৈরি এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!