রাশেদুলইসলাম
বাংলাদেশ অনুপম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা বঙ্গোপসাগরের তীরঘেঁষা দক্ষিণ এশিয়ার ছোট্ট একটি দেশ। এ দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ও সৌন্দর্য এবং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আবহমানকাল থেকেই দেশটি বহির্বিশ্বের নজরে এসেছে। এই নজরে আসা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এ দেশ ও দেশের মানুষের জন্য ক্ষতির কারণ হয়েছে; দেশের মানুষ যুগে যুগে লুণ্ঠন ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে, দেশ পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়েছে। ১৯৭১ সালে দেশটি একটি রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করে। কিন্তু সাধারণ জনগণের ন্যায্য অধিকার পাওয়ার বিষয়টি অধরাই থেকে যায়। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে ঘটে যাওয়া ছাত্রজনতার একটি গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাসীন সরকার ক্ষমতা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয় । অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে বিভিন্ন সংস্কারমূলক কাজ শুরু করলেও এ দেশের এক শ্রেণির সুযোগসন্ধানী মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন থেকে চলে আসা ঘুষ, দুর্নীতি ও বিভিন্ন প্রকার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হ্রাস না পেয়ে বাস্তব অবস্থা ধীরে ধীরে পূর্বরূপ ধারণ করে এবং কোনও কোনও ক্ষেত্রে অপরাধের মাত্রা ও ব্যাপকতা পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি বৃদ্ধি পায় । সুখের কথা অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে । নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে জনাব তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নতুন সরকার গঠন করেছেন । কিন্তু দেশের সুযোগসন্ধানীমানুষেরদুর্নীতি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের উৎসমুখনির্ণয় এবং মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের যথাযথ প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করানা হলে দেশের দুর্নীতি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডনিরসন করে সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেকাম্য সমাধান পাওয়া সম্ভব নাও হতে পারে ।
২.০ প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের প্রায় সকল প্রকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক অপরাধ সংঘটনের মূলে প্রধানত ৩টি কারণ কাজ করে:
২.১ শিক্ষিত শ্রেণির মানুষের স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিক চিন্তা:
আমাদের দেশের শিক্ষিত শ্রেণির মানুষ সাধারণত স্বার্থপর ও আত্মকেন্দ্রীক।নিজের জীবনে উন্নতি চাওয়া কারও জন্য দোষের কিছু নয়। কিন্তু আমাদের শিক্ষিত শ্রেণির মানুষের মধ্যে অনেকেই আছেন, যাঁরা নিজের উন্নতির জন্য অন্যের ক্ষতি করতেও দ্বিধাবোধ করেন না। যিনি চাকরি করেন এবং অনৈতিকভাবে অর্থ উপার্জন করেন, তাঁর অনৈতিক পন্থা অবলম্বনের কারণে কোনও সেতু ভেঙ্গে পড়বে কিনা - তা নিয়ে তাঁর কোনও মাথাব্যাথা নেই। যিনি খাদ্য ব্যবসায়ী, তিনি মুনাফা অর্জনের জন্য খাদ্যে ভেজাল দিয়ে থাকেন। কিন্তু, এই ভেজাল খাদ্যের কারণে কারও ক্যানসারহবে কিনা, তা নিয়ে তাঁর কোন মাথাব্যাথা নেই।যিনি মনে করেন, বাংলাদেশ বর্তমানে বসবাসের উপযুক্ত নয়, তিনি দেশ ছেড়ে চলে যেতে চান। কিন্তু, যাঁরা দেশে থাকবেন, তাঁদের কী হবে,এসব নিয়ে তাঁর কোনও মাথাব্যাথা নেই। শিক্ষিত শ্রেণির মানুষের এ ধরণের স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিক চিন্তাই এদেশে সকল প্রকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক অপরাধ সংগঠনের প্রধানতম কারণ।
২.২ পরশ্রীকাতরতা ও প্রতিহিংসাপরায়ণতা:
সমাজে অনেকেই আছেন যাঁরা লোভী ও প্রতিহিংসাপরায়ন।অন্যের সম্পদজবরদখল করা, সম্ভব না হলে তাতে আগুন দেওয়া, বিষ প্রয়োগে মাছ, মুরগি ও গবাদিপশুর জীবননাশ করা, আবাদী জমির ফসল নষ্ট করা, মিথ্যা মামলা রুজু করা ইত্যাদি আমাদের সমাজে অতিসাধারণ ঘটনা।এদেশেপ্রাকৃতিকদুর্যোগেপ্রতিবছরযেপরিমাণক্ষতিহয়, পরিসংখ্যান নিলে দেখাযাবে, মানবসৃষ্টদুর্যোগেরকারণেক্ষতিরপরিমাণপ্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণঅপেক্ষা কোনওঅংশেকমনয়।
২.৩ পারস্পরিকআস্থাহীনতা:
সমাজে মানুষের মধ্যে প্রতারণা ও একে অপরের প্রতি আস্থাহীনতা বেড়েছে। এ কারণে বাবা হত্যার মত মামলায় ছেলেকে তদন্ত ছাড়াই অন্যায়ভাবে আটক করা হলেওমানুষ তা বিশ্বাস করছেন। মানুষের পরস্পরের প্রতি এ ধরণের আস্থাহীনতার কারণে অনেক সুযোগসন্ধানী অপরাধী বিভিন্ন প্রকার অপরাধমূলক কাজ করার সুযোগ নিচ্ছেন। মানুষের একে অপরের প্রতি আস্থাহীনতা সুষ্ঠু সমাজ বিকাশের পথে অন্তরায় এবং তা দেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নতির পথে বড় বাধা হিসেবে কাজ করে ।
উল্লিখিত তিনটি কারণের উৎসমূলে রয়েছে সমাজে মানুষের মধ্যে ক) অবাধ মিথ্যাচার, খ) দেশপ্রেমের অভাব এবং গ) ধর্ম ও নৈতিকতাবোধ একেবারেই কাজ না করা।
আমাদের দেশে সামাজিক ও অর্থনৈতিক যেকোনও অপরাধের সাথে ওপরের তিনটিকারণ কোনও না কোনওভাবে সম্পর্কিত।আরএসবকারণওউৎসমূলেরঅণুঘটকহিসেবেকাজকরেমানুষেরদৃষ্টিভঙ্গি।
৩.০দৃষ্টিভঙ্গিকি ?
দৃষ্টিভঙ্গিহলোকোনব্যক্তি, বস্তু, ঘটনাবাপরিস্থিতিসম্পর্কেএকজনমানুষেরনিজস্বচিন্তাধারাবামনোভাব।কোয়ান্টামফাউন্ডেশনেরএকটিজনপ্রিয়শ্লোগান, ‘দৃষ্টিভঙ্গিবদলান, জীবনবদলেযাবে’।কোয়ান্টামফাউন্ডেশনেরপ্রতিষ্ঠাতামহাজাতকমানুষেরদৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের লক্ষ্যেবিভিন্নআত্মউন্নয়নমূলককোর্সপরিচালনাকরেথাকেন।এধরণেরকোর্সদ্বারাআমিনিজেওসমৃদ্ধহয়েছি।দৃষ্টিভঙ্গিকে মানুষের চালিকা শক্তিবলা যায় । কারণ, মানুষের মন পরিচালিত হয় দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা । আর মস্তিস্ককে চালায় মন । বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ গবেষণা করেছেন মানুষের মন ও মস্তিস্কের সম্পর্ক নিয়ে । ড এলেন গোল্ডস্টেইন, ড জন মটিল, ড ওয়াইল্ডারপেনফিল্ড ও ড ই রয় জন দীর্ঘ গবেষণার পর বলেছেন, একজন প্রোগ্রামার যেভাবে কম্পিউটারকে পরিচালিত করে, তেমনি মানুষের মন তাঁর মস্তিস্ককে পরিচালনা করে। মস্তিস্ক হচ্ছে হার্ডওয়ার এবং মন সফটওয়ার । নতুন তথ্য ও নতুন বিশ্বাস মস্তিস্কের নিউরনে নতুন ডেনড্রাইট সৃষ্টি করে। নতুন সিন্যাপসের মাধ্যমে তৈরি হয় সংযোগের নতুন রাস্তা । বদলে যায় মস্তিস্কের কর্মকাঠামো । মস্তিস্ক তখন নতুন দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে নতুন বাস্তবতা উপহার দেয় । কিন্তু নতুন বাস্তবতা ভালো হবে না খারাপ হবে, কল্যাণকর হবে না ক্ষতিকর হবে, তা নির্ভর করে মস্তিস্কে দেওয়া তথ্য বা প্রোগ্রামের ভাল-মন্দের ওপর। কল্যাণকর তথ্য ও বিশ্বাস কল্যাণকর বাস্তবতা সৃষ্টি করে, আর ক্ষতিকর তথ্য বা বিশ্বাস ক্ষতিকর বাস্তবতা উপহার দেয় । তাই মানুষের জীবনের নতুন বাস্তবতার চাবিকাটি হচ্ছে দৃষ্টিভঙ্গি ।
বিজ্ঞানীরা বলেন দৃষ্টিভঙ্গি দু’ধরনের-
একঃ প্র-একটিভ দৃষ্টিভঙ্গি- যেকোন পরিস্থিতিতে কি নেই চিন্তা না করে যা আছে, তাই নিয়ে সুপরিকল্পিতভাবে লক্ষ্য অর্জনের জন্য কাজ করা প্র-একটিভ দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারি মানুষের কাজ । এ ধরণের মানুষের নিয়ন্ত্রণ তাঁর নিজের হাতে থাকে । প্র-একটিভ দৃষ্টিভঙ্গি জীবনে ইতিবাচকতা তৈরি করে, সাফল্য ও বিজয় ছিনিয়ে আনে।
দুইঃ রি- একটিভ দৃষ্টিভঙ্গি- সবকিছুতে নিরাশ হওয়া, সব সময় হতাশায় ভোগা রি- একটিভ দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারি মানুষের লক্ষণ । তাঁরা অন্য মানুষের কথায় প্রভাবিত হন । এ ধরণের মানুষের নিয়ন্ত্রণ তাঁর নিজের হাতে থাকে না । রি- একটিভ দৃষ্টিভঙ্গি জীবনে নেতিবাচকতা সৃষ্টি করে । এ ধরণের দৃষ্টিভঙ্গিরমানুষ বিভ্রান্তিতে ভোগেন (মহাজাতক) । মহাজাতকের আলোচনার মর্ম অনুযায়ী সমাজের রি-একটিভ দৃষ্টিভঙ্গির মানুষদের প্র-একটিভ মানুষে রুপান্তর করা সম্ভব হলে সমাজে মানুষের মধ্যে দুর্নীতি ও অপরাধপ্রবণতা নিরসন ও কাম্য সামাজিক উন্নয়ন সহজ হতে পারে ।
৪.০ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচকতা বা নেতিবাচকতা সাধারণত তাঁর পারিপার্শ্বিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে । আমাদের দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা ও ধর্মীয় ব্যাখ্যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে নেতিবাচকতার জন্ম দেয়। কারণ, দৃষ্টিভঙ্গি মূলত একজন মানুষের সহজাত । সেই সহজাত বিষয়টিই পরিবারে বাবামা ও অন্যান্য সদস্য, প্রতিবেশি এবং সমাজের বিভিন্ন মানুষের বাস্তব কর্মকাণ্ডে তার মধ্যে পোক্ত হয়ে ওঠে । তবে দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি কারও ব্যক্তিগত বিষয় নয়,বলা যায় যেকোন দৃষ্টিভঙ্গি মূলত সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি । আর সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি রাতারাতি গড়ে ওঠে না । কোন কোন দৃষ্টিভঙ্গি শতশত বর্ষব্যাপী সমাজে চলমান রয়েছে । দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক অথবা নেতিবাচক হওয়ার সুযোগ থাকলেও আমাদের দেশের মত দেশগুলোতে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি মূলত নেতিবাচক ভুমিকা পালন করে থাকে ।
৪.১দৃষ্টিভঙ্গির উৎস কি ?
এ প্রশ্নের উত্তরে বলা যায় দৃষ্টিভঙ্গির প্রধান উৎস দেশের সংস্কৃতি, ধর্ম ও কবিসাহিত্যিকসহ সমাজের চিন্তাশীল মানুষের অভিজ্ঞতাপ্রসূত উক্তি - যা একপর্যায়ে প্রবাদ বাক্যে পরিণত হয় । এখানে কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে । প্রথমে পারস্যের বিখ্যাত কবি ওমর খৈয়ামের একটি কবিতার উল্লেখ করা যেতে পারে । ওমর খৈয়াম মধ্যযুগের কালজয়ী একজন ফার্সি কবি । তাঁর ছোট ছোট কবিতা সংকলন রুবাইয়া- ই-ওমর খৈয়াম পৃথিবী বিখ্যাত । ওমর খৈয়াম ৮৯১ বছর আগে ১১৩১ সালে মৃত্যুবরণ করেন । ভারত উপমহাদেশে প্রায় ছয়শত বছর দাপ্তরিক ভাষা ছিল ফার্সি। একারণে ওমর খৈয়ামের মত ফার্সি কবিদের প্রভাব তৎকালীন ভারতীয় সমাজব্যবস্থা শুধু নয়, আমাদের বর্তমান সমাজেও অনেক বেশি লক্ষণীয়। কাজী নজরুল ইসলাম রুবাইয়া- ই-ওমর খৈয়াম বাংলায় অনুবাদ করেন । তবে এখানে কান্তিচন্দ্র ঘোষ অনূদিত ওমর খৈয়ামের একটি কবিতা নীচে দেওয়া হোল-
‘নগদ যা পাও হাত পেতে নাও
বাকির খাতায় শূন্য থাক ।
দূরের বাদ্য কাজ কি শুনে
মাঝখানে যে বেজায় ফাঁক’ ।
এই সর্বজনবিদিত কবিতার সারকথা হচ্ছে, ‘তুমি নগদ বা তাৎক্ষণিক যা পাও, সেটাই গ্রহণ করে নাও; কারণ, পরে তুমি তা নাও পেতে পারো’। বর্ণিত কবিতা থেকে আমাদের সমাজে যে প্রবাদ বাক্য চলমান, তা হোল, ‘সুযোগ জীবনে একবারই আসে’। এ কথার অর্থ হোল, ‘তুমি কোন সুযোগ পাওয়া মাত্রই সেই সুযোগ গ্রহণ করবে। কারণ, পরে সেই সুযোগ তুমি আর পাবে না’ । আমার মনে হয়েছে, এটি আমাদের সমাজে ব্যক্তি মানুষের মধ্যে মূল্যবোধ অবক্ষয়ের উল্লেখযোগ্য একটি কারণ । এই প্রবাদ বাক্য থেকে সৃষ্টি হওয়া দৃষ্টিভঙ্গি সমাজের মানুষকে যেকোন ক্ষেত্রে সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে ইন্দন যোগায় । কেউ নিজের বা পরিবারের কারও চিকিৎসার জন্য একান্ত নিরুপায় হয়ে নিজের ভিটেবাড়ি বিক্রি করতে চাইলে, পরিচিতজনদের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসা একজন ক্রেতা নামমাত্র মূল্যে সেটা কেনার চেষ্টা করে । কারণ এটা তাঁর জন্য একটা অসহায় মানুষের কাছ থেকে লাভ পাওয়ার সুযোগ। কেউ নির্বাচনে জয়ী হলে নির্বাচিত পদের মেয়াদ থাকার মধ্যে, কেউ চাকরি পেলে চাকরিকালের মধ্যে ভাগ্য গড়ার চেষ্টা করেন অনেকে । কারণ চাকরি পাওয়া বা নির্বাচিত হওয়া তাঁর জন্য একটা সুযোগ । সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সাধারণত কেউ কোন সুযোগ সাধারণ মানুষের সেবা করার বিরল সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন না ।
৪.২ ধর্ম থেকে আসা দৃষ্টিভঙ্গির উদাহরণও এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে । বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশ । আলোচনা সংক্ষেপ করার জন্য এখানে কেবল ইসলাম ধর্মের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে।এ কথা সত্য যে, কোরআনে বলা হয়েছে, শেষ বিচারের দিন যার সৎকর্মের পাল্লা ভারি হবে, সে বেহেশতে এবং যার সৎকর্মের পাল্লা হালকা হবে সে হাবিয়া (দোযখ) যাবে (সূরা কারিয়াহ)। তারমানে এই নয় যে, একজন মানুষ ইচ্ছামত পাপ করার পাশাপাশি ইচ্ছামত ইবাদত করে বেহেশত যেতে পারবেন । কোরআনে একথা বলা হয়নি যে, হজ্জ করলে সকল প্রকার গুনাহ বা পাপ মোচন হবে । কিন্তু সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি এই যে, অবৈধ পন্থায় ইচ্ছামত অর্থ উপার্জন করার পর, এমনকি এতিমের সম্পদ আত্মসাত করার মত পাপ করা হলেও হজ্জ করার মাধ্যমে সেসব পাপ মোচন করা যায় । ধর্ম বিষয়ে এ ধরণের দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে দুর্নীতি ও অপরাধমূলক কাজ করতে ইন্দন যোগায় - যা সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার পথে অন্তরায় হিসেবে কাজ করে।
৫.০ দেশের সংস্কৃতি, ধর্ম ও কবিসাহিত্যিকসহ সমাজের চিন্তাশীল মানুষের অভিজ্ঞতাপ্রসূত উক্তি থেকে সৃষ্টি হওয়া দৃষ্টিভঙ্গিকে দু’টি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে-
৫.১ আর্থ-সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিঃ
৫.১.১ কারও ক্ষতি করতে পারাই ক্ষমতাঃ
আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী কারও ক্ষতি করতে পারাটাই আসল ক্ষমতা । আমাদের সমাজে নারী, পুরুষ, ধনী বা দরিদ্র এমন কাউকে পাওয়া যাবে না, যিনি কাউকে ‘তুই আমাকে চিনিস’? এই প্রশ্নটি করেন নি । এই প্রশ্নের পরের অংশ অনেকে বলেন, অনেকে তা বলার প্রয়োজন বোধ করেন না । পরের অংশ হচ্ছে, ‘আমি তোর বারোটা বাজাতে পারি’। তারমানে একজনের ক্ষতি করার ক্ষমতা থাকা বা বাস্তবে কারও ক্ষতি করাটাই আমাদের সমাজে ক্ষমতা থাকার লক্ষণ হিসেবে গণ্য করা হয় । যার কারও ক্ষতি করার ক্ষমতা নেই, সমাজে তাঁর কোন মূল্য নেই । এটাই আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি । অথচ, বাস্তবে ক্ষতি করার জন্য কোন ক্ষমতার প্রয়োজন হয় না। একজন রিক্সাওয়ালা মন্ত্রী পর্যায়ের একজন মানুষকে তাঁর রিক্সা থেকে ফেলে দিয়ে ক্ষতি করতে পারেন । একজন কাজের মেয়ে খাবারে বিষ মিশিয়ে একটি পরিবারের সকলকে হত্যা করতে পারেন; এজন্য কোন ক্ষমতা দরকার নেই । বরং, ক্ষমতার প্রয়োজন হয় কারও উপকার করতে । কারও বিপদ থেকে উদ্ধার করা, বা কারও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে ক্ষমতা লাগে । শুধু প্রচলিত সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে মানুষ অন্যের ক্ষতি করতে বেশি উৎসাহিত হয়ে থাকেন ।
৫.১.২ ক্ষমতা ও সম্মানের উৎস অর্থঃ
আমাদের সমাজে মনে করা হয় ক্ষমতাবান মানুষকে সবাই সম্মান করে, আর ক্ষমতার উৎস হচ্ছে টাকা । যাদের টাকা আছে, অর্থ আছে, কেবল তারাই ক্ষমতা অর্জন করতে পারেন । এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সবাই যেকোন উপায়ে অর্থ উপার্জন করার চেষ্টা করে থাকেন । যেকোন উপায়ে অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করতে গিয়েই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানুষ দুর্নীতি বা অবৈধ পন্থার সুযোগ নিয়ে থাকেন । এতে সমাজে অশান্তি বাড়ে, এক ধরণের নৈরাজ্যকর অবস্থার সৃষ্টি হয় । কিন্তু প্রকৃত অর্থে মানুষের ক্ষমতা বা অর্থ কেন দরকার সে বিষয়টি কেউ ভেবে দেখেন না । মানুষ আসলে অর্থ ও প্রতিপত্তি চায় মূলত শান্তির জন্য । কিন্তু অর্থ বা ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত যে জীবনে অশান্তির কারণ হয়ে ওঠে, সে দিকটা ভাবা হয় না ।
৫.২ ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিঃ
৫.২.১ সৎকর্ম নয়; ইবাদতমুখি দৃষ্টিভঙ্গিঃ
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৯১.০৪% মুসলমান এবং ৭.৯৫% হিন্দু (জনশুমারী ২০২২)। অর্থাৎ, মুসলমান ও সনাতন হিন্দু– এই দু’টি ধর্মবিশ্বাসী মানুষ বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৯৯%(৯৮.৯৯%)। মুসলমানদের কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে সৎকর্মে কে অগ্রগামী তা পরীক্ষার জন্যই তিনি (আল্লাহ) জীবন সৃষ্টি ও মৃত্যুর ব্যবস্থা করেছেন (সূরা মূলক, আয়াত ২)। হিন্দু ধর্মের বেদ-উপনিষদ ঘেঁটে স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর’ । উভয় ধর্মে মানুষের সৎকর্মের ওপর অত্যাধিক গুরুত্ব দেওয়া হলেও উভয় ধর্মের দৃষ্টিভঙ্গি যথাক্রমে ইবাদত ও পূজা-অর্চনামুখি; সৎকর্মমুখি নয়। উভয় ধর্মবিশ্বাসীদের অনেকেই মনে করেন, কারও উপকার করতে গেলে নিজে বিপদে পড়তে হয়। এ কারণে নিজেদের ধার্মিক হিসেবে পরিচয় দিলেও, অনেকে প্রকাশ্যে অন্যকে সৎকাজে নিরুৎসাহিত করে থাকেন। ধর্ম আচরণ সৎকর্মমুখি না হওয়ার কারণে এদেশে সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ধর্মের ভুমিকা তেমন উল্লেখযোগ্য নয় ।
৬.০ দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের উপায়:
সম্প্রতি একটি জরিপের রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ৯৮.৮% মানুষ ধর্ম বিশ্বাসী এবং তাঁরা পরকালের জবাবদিহিতায় বিশ্বাস করেন (দি ঢাকা ডায়েরি, ১১ এপ্রিল, ২০২৬)।তারমানে এই সত্য আবারও প্রমাণিত হোল যে, বাংলাদেশের মানুষ সত্যিকার অর্থে ধর্মভীরু। কিন্তু এটা যদি সত্য হয়, তাহলে বাংলাদেশে দুর্নীতি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের হার এত বেশি কেন ? যারা ধর্মের জন্য নিজের জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দিতে রাজি, তাঁরা এতো বেশি পাপ কাজ কিভাবে করেন ? এ প্রশ্নের জবাব একটাই হতে পারে যে, ধর্মের যে ধরণের ব্যাখ্যা দিলে একজন মানুষ পাপকাজ করা থেকে বিরত থাকবেন, সে ধরণের ব্যাখ্যা দেওয়া হয় না । তবে কোরআন অধ্যয়ন করতে গিয়ে আমার নিজের মনে হয়েছে, ইসলামকে শান্তির ধর্ম বলা হলেও, পবিত্র কোরআনের সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠার সাথে সম্পর্কিত বিধানগুলো সুদীর্ঘকাল থেকে উপেক্ষিত রয়ে গেছে; সাধারণ মুসলমান ধর্মের সেসব বিধান সম্পর্কে একেবারেই জানেননা । ধর্মের কোন বিধান জানা না থাকলে, ধর্মবিশ্বাসী মানুষের জন্য তা মানার বিষয়টি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। তবে সত্যিকার অর্থে দেশের ধর্মবিশ্বাসী মানুষের মধ্যে দুর্নীতি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডজনিত সমস্যা নিরসন ও সামাজিক উন্নয়নে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের সুপরিকল্পিত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহনের ক্ষেত্রে ধর্মের বিষয়টি অন্তর্ভুক্তি অত্যাবশ্যক।
৬.১ আমাদের দেশে সামাজিক ও অর্থনৈতিক যেকোনও অপরাধের সাথে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিগত কারণকোনও না কোনওভাবে সম্পর্কিত।তবে সমাজে মানুষের মধ্যে দুর্নীতি ও অপরাধপ্রবণতা অনেকটা ব্লাড ক্যানসারের রূপ নিয়েছে। ব্লাড ক্যানসার নিরাময়ের জন্য যেমন ক্যানসারআক্রান্ত রোগীর গোটা শরীরের রক্ত বদল করতে হয়; সমাজের চলমান সামাজিকওঅর্থনৈতিক সমস্যা নিরসন করতে হলেও একইভাবে গোটা সমাজের মানুষের মন-মানসিকতা বা দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দরকারযা বাস্তব সম্মত নয় এবং স্বল্প-মেয়াদে তা সম্ভবও নয়। তবেদৃষ্টিভঙ্গিযেমনরাতারাতিগড়েওঠেনা, তেমনিরাতারাতিএরপরিবর্তনওসম্ভবনয়।এরুপক্ষেত্রেশিশুকিশোরদেরজন্যশুদ্ধাচারঅনুশীলনমূলকদীর্ঘমেয়াদীএবংবড়দেরমধ্যেদৃষ্টিভঙ্গিপরিবর্তনবিষয়েসচেতনতাসৃষ্টিমূলকস্বল্পমেয়াদীবিভিন্নব্যবস্থাগ্রহণকরাযেতেপারে।
৬.২প্রাথমিক শিক্ষা পর্যায়েসুপরিকল্পিতভাবে শুদ্ধাচার অনুশীলনে চল্লিশের চর্চা বাস্তবায়ন করা হলে, শিশুকিশোরদের চিন্তাচেতনায় ইতিপূর্বেউল্লিখিত ৩টি বদগুণ (অবাধমিথ্যাচার, দেশপ্রেম, ধর্মওনৈতিকতাবোধেরঅভাব) দানা বাঁধতে পারবে না।এব্যবস্থায়ভবিষ্যতেবাংলাদেশে জনকল্যাণমুখী একটি আদর্শ নাগরিকসমাজ গড়ে তোলাসম্ভবহবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে,অর্পণ- দর্পণ স্মৃতি ফাউন্ডেশন শিশু-কিশোরদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের লক্ষ্যে দেশের বিভিন্নজেলারপ্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় পর্যায়েসীমিতপরিসরে‘শুদ্ধাচার অনুশীলনে চল্লিশের চর্চা’ কর্মসূচিবাস্তবায়ন করে আসছে। চল্লিশের চর্চা অনুশীলনে প্রতিযোগী শিক্ষার্থী ৪০দিনব্যাপী মিথ্যাকথা বলা থেকে বিরত থেকে তাদেরকে প্রদত্ত নোটবুকের গাইডলাইন অনুযায়ী ভালোকাজেঅংশনিয়েথাকে । এ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য শিক্ষার্থীকে সত্যবাদিতা, দেশপ্রেম, ধর্ম ও নীতিনৈতিকতাবোধের বাস্তব চর্চায় উদ্বুদ্ধ করা- যেন তারা ভবিষ্যতে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে । তবে, প্রাথমিক শিক্ষা পর্যায়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা ২ কোটি ৫০ লাখের মত । কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা সম্ভব নয় । সরকার থেকে শুদ্ধাচার অনুশীলনে চল্লিশের চর্চা প্রাথমিক শিক্ষা পর্যায়ে বাধ্যতামূলক শিক্ষা বহির্ভূত কার্যক্রম (Extracurricular) হিসেবে একটিকর্মসূচিঘোষণা করা হলে, এদেশেভবিষ্যতে দুর্নীতি ও অপরাধমুক্ত উন্নত সমাজ গঠনে তা কার্যকর ভুমিকা হিসেবে গণ্য হতে পারে ।
৭.০বড়দের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের বিষয়টি অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের । তবে এবিষয়ে বিভিন্ন প্লাটফরমে সভাসমিতি বা আলোচনা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের প্র- একটিভ দৃষ্টিভঙ্গিতে উজ্জীবিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন অংশীজনের সাথে নিম্নরূপ বিষয়ে মতবিনিময় করা যেতে পারে-
৭.১ প্রবাদ বাক্যের ইতিবাচক ব্যাখ্যা:
আমাদের সমাজে সাধারণত যে কোন প্রবাদ বাক্য বা প্রবাদ বাক্য তুল্য বচনের নেতিবাচক ব্যাখ্যা দেওয়া হয় । যেমন দেওয়া হয়েছে ওমর খৈয়ামের কবিতার । জীবনে সুযোগ পাওয়ার অর্থ কি? এই সুযোগ কি ভালো কাজ করার জন্য, না খারাপ কাজ করার জন্য ? আমরা দু’বন্ধু একবার আমেরিকাতে প্রাকৃতিক দুর্যোগে পড়েছিলাম । সেই দুর্যোগপূর্ণ রাতে মেক্সিকান এক ভদ্রলোক তাঁর গাড়ীতে আমাদের হোস্টেলে পৌঁছে দেন । তিনি কোন ভাড়া নেননি । তাঁর ভাষায় তিনি দুর্যোগ আক্রান্ত দুজন মানুষকে উপকার করার সুযোগ নিয়েছেন; ভবিষ্যতে আমরা যেন এমন কিছু করি।
৭.২ কারও ক্ষতি করতে ক্ষমতা লাগে না:
বাস্তবে ক্ষতি করার জন্য কোন ক্ষমতার প্রয়োজন হয় না । একটি এডিস মশা বা কুকুরের কামড়ে একজন অতি প্রভাবশালী মানুষের করুণ মৃত্যু হতে পারে । এখানে এডিস মশা বা কুকুরের কি ক্ষমতা আছে ? আগেই বলা হয়েছে একটি কাজের মেয়ে খাবারে বিষ মিশিয়ে পরিবারের সকলকে হত্যা করতে পারেন। এজন্য কোন ক্ষমতার দরকার নেই । প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতার প্রয়োজন হয় কারও উপকার করতে । কারও বিপদ থেকে উদ্ধার করা, বা কারও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে ক্ষমতা লাগে । কারও ক্ষতি করা ধর্মের পরিপন্থী কাজ । শুধু সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে মানুষ অন্যের ক্ষতি করতে উৎসাহিত হয়ে থাকেন, যা অনেক বড় পাপের কাজ । ধর্মে অন্যকে উপকার করা এবং বিভিন্ন সমাজকল্যাণমূলক কাজে মানুষের মধ্যে প্রতিযোগিতা করার বিধান রয়েছে (সূরা মূলক)। শুধু ইসলাম নয়, সকল ধর্মেই জনকল্যাণমূলক কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ।
৭.৩ ক্ষমতা ও সম্মানের উৎস অর্থ:
আমাদের সমাজে মনে করা হয় ক্ষমতাবান মানুষকে সবাই সম্মান করে, আর ক্ষমতার উৎস হচ্ছে টাকা । যাদের টাকা আছে, অর্থ আছে কেবল তারাই ক্ষমতা অর্জন করতে পারেন । এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সবাই যেকোন উপায়ে অর্থ উপার্জন করার চেষ্টা করে থাকেন । যেকোন উপায়ে অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করতে গিয়েই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানুষ দুর্নীতি বা অবৈধ পন্থার সুযোগ নিয়ে থাকেন । এতে সমাজে অশান্তি বাড়ে, এক ধরণের নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়। কিন্তু প্রকৃত অর্থে মানুষের ক্ষমতা বা অর্থ কেন দরকার সে বিষয়টি কেউ ভেবে দেখেন না । মানুষ পৃথিবীর অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা কেবলমাত্র তাঁর চিন্তাশক্তি ও বিবেকের কারণে । চিন্তাশক্তি ও বিবেক দিয়ে কাজ না করলে মানুষ মানুষ নয় বলে কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছে (সূরা আনফাল, আয়াত ২২) । মানুষ অর্থ ও প্রতিপত্তি চায় মূলত শান্তির জন্য । কিন্তু অর্থ বা ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত যে জীবনে অশান্তির কারণ হয়ে ওঠে সে দিকটা সাধারণত ভাবা হয় না । ।
৭.৪ ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি সৎকর্ম নয়; ইবাদতমুখি:
পবিত্র কুরআনে মানব সৃষ্টির ৩টি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে । অর্থাৎ, ৩টি বিশেষ কাজ করার জন্য মানুষ সৃষ্টি করা হয়েছে । এক- আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করা (সূরা বাকারা, আয়াত ৩০), দুই- সৎকাজে প্রতিযোগিতা করা (সূরা মূলক, আয়াত ২) এবং ৩) আল্লাহর ইবাদত করা। কিন্তু সাধারণ মুসলমান জানেন কেবলমাত্র আল্লাহর ইবাদত করার জন্যই জিনের মত মানুষ সৃষ্টি করা হয়েছে । এদেশের ৯৫% মানুষ দরিদ্র । আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে নামাজ রোজা পালন করা ছাড়া তাঁদের আর কোন ধর্মীয় দায়িত্ব নেই মনে করা হয়। সৎকাজে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করার কথা বা আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে করণীয় কী- তা না জানার কারণে সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় মুসলমান হিসেবে তাঁর কাজের বাধ্যবাধকতা এ দেশের সাধারণ মুসলমানের জানা নেই । এ বিষয়ে আলেম-উলেমা এবং মসজিদের ইমামগণের গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে । সৎকর্ম ইবাদতের মত সমান গুরুত্বপূর্ণ একথা সাধারণ মুসলমানদের অবহিত করা হলে সমাজে সৎকর্মের পরিমাণ বাড়বে- যা সামাজিক উন্নয়নে ভুমিকা রাখতে সক্ষম । অন্যান্য ধর্মবিশ্বাসী মানুষের ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য ।
৭.৫ সুন্নাহ পালনের ক্ষেত্রে হাদিসে ফেলির সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা
বাস্তবে মহানবী (সঃ) নিজে যা কিছু করেছেন সেগুলো হাদিসে ফেলি হিসেবে গণ্য । এসব কাজের মধ্যে নবীর বিবাহ, নামাজ পড়া, দাঁতমাজা ইত্যাদি বিবেচনা করা হয় । কিন্তু প্রকৃতঅর্থে এগুলোর কোনটাই কাজ হিসেবে গণ্য নয় । নবী করিম (সঃ) এঁর কাজ বলতে তাঁর পেশা ব্যবসাকে বোঝানো যৌক্তিক । এরুপ ক্ষেত্রে মানুষের যেকোন বৈধ পেশা, যা দ্বারা তিনি জীবিকা নির্বাহ করেন, সেসব পেশার কাজ নবীরসুন্নত হিসেবে পালনীয় হতে পারে । মানুষ সাধারণত তাঁর পেশার পরিচয়ে দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে থাকে । পেশাকে নবীর সুন্নত হিসেবে ঘোষণা করা হলে ধীরে ধীরে পেশাজীবী মানুষের মধ্যে দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়ার প্রবণতা কমে আসবে । এক্ষেত্রে শুধু নবীর পেশা ব্যবসা-ই নয়, লাঙ্গল চাষ, রিক্সা চালানোসহ সকল কর্মজীবী মানুষের পেশাই সুন্নত হিসেবে গণ্য করার সুযোগ রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয় ।
আমাদের সমাজের দুর্নীতি ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিরসনের মাধ্যমে সমাজ উন্নয়নের লক্ষ্যে বর্ণিত উপায়ে মানুষের মধ্যে প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের বিভিন্ন জনসচেনতামুলক ব্যবস্থা গ্রহন করা যেতে পারে । তবে ধর্মীয় বিষয় প্রচারণাকার্যক্রমে মসজিদের ইমাম এবং দেশের আলেম-ওলেমাগণকে সম্পৃক্ত করা গেলে তা অধিকতর ফলপ্রসূ হতে পারে ।
লেখকঃ প্রধান নির্বাহী
অর্পণ-দর্পণ স্মৃতি ফাউন্ডেশন, ও সাবেক সচিব
No comments yet. Be the first to comment!