ভবিষ্যতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে যাতে কোনো বিতর্ক তৈরি না হয়, সে লক্ষ্যে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি তৈরি করতে চান বলে জানিয়েছেন সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার কীভাবে গঠিত হবে এবং এতে কারা থাকবেন—এসব বিষয় সংসদে আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হবে। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছ থেকে প্রস্তাব নেওয়া হচ্ছে। এসব প্রস্তাব পর্যালোচনা করে বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকা একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করা হবে।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির ষষ্ঠ বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, “আমরা সবাইকে নিয়ে স্টাডি করে এমন একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি গ্রহণ করতে চাই, যেটা বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকবে।”
রাষ্ট্রপতিকে ‘সর্বশেষ অপশন’ না রাখার প্রস্তাব
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিধানে রাষ্ট্রপতিকে সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে রাখার বিষয়টি নিয়ে অতীতে বিতর্ক হয়েছে বলে উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, এ কারণে রাষ্ট্রপতিকে সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে না রাখাই ভালো বলে মনে করছে কমিটি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের বিষয়ে বিভিন্ন পক্ষের মতামত সংগ্রহ করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, বিরোধী রাজনৈতিক দলসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছ থেকে প্রস্তাব নেওয়া হবে। এ ছাড়া সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সাবেক বিচারপতি, আইনজীবী, আইন বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের সঙ্গেও আলোচনা করা হবে।
ভবিষ্যতে যাতে সহজে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পরিবর্তন করা না যায়, সে বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। এ ক্ষেত্রে জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
গণহত্যার বিচার দ্রুত করার কথা
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবি রয়েছে।
তিনি বলেন, বিচারপ্রক্রিয়া স্বাধীনভাবে চলছে এবং আদালত নির্ধারিত আইন অনুযায়ী কাজ করবে। তবে তদন্ত, প্রসিকিউশন ও অভিযোগ গঠনের মতো প্রক্রিয়াগুলো দ্রুত সম্পন্ন করতে সরকার আন্তরিক।
জুলাইয়ের সাংবিধানিক স্বীকৃতির প্রস্তাব
বিশেষ কমিটির বৈঠকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অবদান রাখা শহীদ পরিবারের সদস্য, আহত জুলাই যোদ্ধাসহ বিভিন্ন সংগঠনের ৬৩ জন প্রতিনিধি অংশ নেন।
তাঁরা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, জুলাই ঘোষণাপত্রকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা, জুলাই যোদ্ধাদের আইনি সুরক্ষা ও দায়মুক্তি, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এবং আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতামত দেন।
আলোচনায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ও ঘোষণাপত্রকে সংবিধানের উপযুক্ত অংশে স্থায়ীভাবে যুক্ত করার প্রস্তাব আসে। পাশাপাশি জুলাই যোদ্ধাদের হয়রানি ও আইনগত জটিলতা নিরসন এবং তাঁদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করতে বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংস্কারের পাশাপাশি সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ বিধান পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোটের বিধান রাখার প্রস্তাবও দেওয়া হয়।
রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে নিরাপদ ও বৈষম্যহীন পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়েও বৈঠকে মতামত দেন অংশগ্রহণকারীরা।
‘চূড়ান্ত পর্যায়ে আসেনি কমিটি’
বৈঠকে অংশ নেওয়া অতিথিদের দেওয়া প্রস্তাবগুলো কমিটির বিবেচনার জন্য গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আলোচনার বাইরে কারও লিখিত প্রস্তাব থাকলে তা কমিটির কাছে পাঠানোর অনুরোধ করা হয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং জুলাই ঘোষণাপত্রের বিষয়গুলো সংবিধানের উপযুক্ত জায়গায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে অংশগ্রহণকারীরা মত দিয়েছেন।
তিনি বলেন, জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষার জন্য করা অধ্যাদেশ ইতিমধ্যে আইনে পরিণত হয়েছে। তাঁদের সুরক্ষা ও দায়মুক্তির বিষয়টি সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিত করতে সংবিধানে তা অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
কমিটি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি জানিয়ে তিনি বলেন, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সাবেক বিচারপতি, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইন বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের কাছ থেকে আরও গুরুত্বপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য প্রস্তাব পাওয়া গেলে সেগুলো পর্যালোচনা করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বৈঠকে কমিটির সদস্য আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নূরুল হক এবং সাকিলা ফারজানা উপস্থিত ছিলেন।
আরএস-রাসেল
No comments yet. Be the first to comment!