রাজনীতি

বিএনপির অতীতের সাফল্য রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে অনুপ্রেরণা: শামা ওবায়েদ

আপডেট: অক্টো ১৫, ২০২৬ : ০৫:১৪ এএম ৫ ০
বিএনপির অতীতের সাফল্য রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে অনুপ্রেরণা: শামা ওবায়েদ

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে নতুন করে কূটনৈতিক উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। অতীতে বিএনপি সরকারের আমলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এ উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।

রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শাসনামলে অনুসৃত কূটনৈতিক উদ্যোগগুলো নতুন করে কার্যকর করার চেষ্টা করছে।

শামা ওবায়েদ বলেন, বিএনপি সরকারের আমলে রোহিঙ্গাদের সফলভাবে প্রত্যাবাসনের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের রয়েছে। নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে এবারও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জোরালো সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।

১৯৭৮ সালে মিয়ানমার থেকে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। তৎকালীন বার্মার সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তির আওতায় ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে তাদের প্রত্যাবাসন সম্পন্ন হয় বলে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

শামা ওবায়েদ বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ওই সময় বাংলাদেশে আসা প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসন করা হয়েছিল। পরে ১৯৯২ সালে আরও প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। খালেদা জিয়ার সরকারের আমলে তাঁদের মধ্যে প্রায় দুই লাখ ৩৬ হাজার জনকে প্রত্যাবাসন করা হয়।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর মতে, অতীতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, মিয়ানমারের সঙ্গে ধারাবাহিক রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সম্পৃক্ততা থাকলে প্রত্যাবাসনে অগ্রগতি সম্ভব।

প্রত্যাবাসন শুরু করাই সরকারের লক্ষ্য

২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ব্যাপক অনুপ্রবেশের সময় খালেদা জিয়ার মানবিক ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন শামা ওবায়েদ। তিনি বলেন, চিকিৎসার জন্য লন্ডনে অবস্থানকালে খালেদা জিয়া সীমান্তে আটকে পড়া রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া ও মানবিক আশ্রয় দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।

শামা ওবায়েদ বলেন, বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ বড় ধরনের মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে। তবে দীর্ঘস্থায়ী এই সংকট এখন দেশের অর্থনীতি, সমাজ ও নিরাপত্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে আশ্রয়শিবিরের আশপাশে বসবাসকারী স্থানীয় জনগোষ্ঠীও এর প্রভাবের মুখে পড়ছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়ে আছে। শিবিরগুলোতে প্রতিবছর ৩০ হাজারের বেশি শিশুর জন্ম হচ্ছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার অর্থায়ন কমে আসায় খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও আশ্রয়ের মতো জরুরি সেবা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

এ পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা সংকটকে অনির্দিষ্টকাল ধরে মানবিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রত্যাবাসন শুরু করাই সরকারের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য বলে জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘আমরা অন্তত প্রত্যাবাসন শুরু করতে চাই।’

জাতিসংঘের আরও জোরালো ভূমিকা চায় বাংলাদেশ

শামা ওবায়েদ বলেন, অতীতের প্রত্যাবাসন উদ্যোগগুলোর সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম পার্থক্য হলো আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার মাত্রা। আগের উদ্যোগগুলোতে জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশ, চীন ও মিয়ানমারকে নিয়ে গঠিত ত্রিপক্ষীয় প্রক্রিয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ওই প্রক্রিয়া কার্যকর হয়নি। মিয়ানমারের সঙ্গে প্রত্যাবাসন-সংক্রান্ত সমঝোতা হলেও বড় পরিসরে সংগঠিত প্রত্যাবাসন সম্ভব হয়নি।

এ কারণে বর্তমান সরকার জাতিসংঘ, চীন, আসিয়ানভুক্ত দেশ, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র এবং অন্যান্য প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক অংশীদারকে আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে।

শামা ওবায়েদ বলেন, ‘আমরা আশা করি, জাতিসংঘ এখন এ বিষয়ে আরও গভীরভাবে সম্পৃক্ত হবে।’

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে দেশটির কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি আরাকান আর্মির সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছে বাংলাদেশ। তবে আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ করা এখনো কঠিন বলে জানান তিনি। এ ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক—দুই ধরনের যোগাযোগই অব্যাহত রয়েছে।

জাতিসংঘে পাঁচ দফা প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর

রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্যোগ জোরদার করেছে সরকার। গত ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এক উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ববৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংকট সমাধানে পাঁচটি প্রস্তাব তুলে ধরেন।

প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের সুস্পষ্ট রূপরেখা প্রণয়ন, বেসামরিক মানুষের ওপর সহিংসতা বন্ধ, পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি জোরদার এবং আন্তসীমান্ত অপরাধ দমনে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি।

এর পরদিন ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র স্থায়ী সমাধান হলো তাঁদের নিরাপদে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়া। সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে হওয়ায় এর সমাধানও দেশটিতেই নিহিত বলে উল্লেখ করেন তিনি।

নিউইয়র্ক সফরকালে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গেও রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান নিয়ে আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালেহের সঙ্গে বৈঠকে আরও জোরালো ও সমন্বিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি।

চীন ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সহযোগিতা চায় ঢাকা

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন শামা ওবায়েদ। তাঁর মতে, মিয়ানমারের ওপর চীনের প্রভাব থাকায় প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে দেশটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় দেশটির প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ওই আলোচনায় প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে বেইজিংয়ের সহযোগিতা চাওয়া হয়।

এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও ফিলিপাইনসহ আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার করছে বাংলাদেশ। মিয়ানমারের সঙ্গে এসব দেশের সম্পর্ক থাকায় সংকট সমাধানে তারা নিজেদের প্রভাব কাজে লাগাতে পারে বলে মনে করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।

তুরস্কসহ অন্যান্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশও বাংলাদেশের কূটনৈতিক উদ্যোগে সহযোগিতার আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জানান তিনি।

তবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী কর্তৃপক্ষের উপস্থিতির কারণে সংকট আগের তুলনায় অনেক জটিল হয়ে উঠেছে বলে সতর্ক করেন শামা ওবায়েদ। তিনি বলেন, ‘এটি অত্যন্ত কঠিন একটি সমস্যা। রাতারাতি এর সমাধান হবে না।’

প্রত্যাবাসনের যোগ্য রোহিঙ্গাদের যাচাই ও পরিচয় শনাক্তকরণের কাজ চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, এ প্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্য মিয়ানমারকে বারবার আহ্বান জানানো হয়েছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, অতীতে প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে অর্জিত অভিজ্ঞতা এখনো প্রাসঙ্গিক। তাই দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগের পাশাপাশি জাতিসংঘের জোরালো সম্পৃক্ততা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মাধ্যমে কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখবে বাংলাদেশ।

তিনি বলেন, লক্ষ্য শুধু বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে তাদের ব্যবস্থাপনা চালিয়ে যাওয়া নয়; বরং এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যাতে বাস্তবেই প্রত্যাবাসন শুরু করা যায়।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!