স্বাস্থ্য

অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন ২০২৬: কমবে বিদেশমুখিতা, সাশ্রয় হবে চিকিৎসা ব্যয়

আপডেট: অক্টো ০৮, ২০২৬ : ০৫:৩৩ এএম ১০ ০
অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন ২০২৬: কমবে বিদেশমুখিতা, সাশ্রয় হবে চিকিৎসা ব্যয়

নিকটাত্মীয়ের পাশাপাশি ‘ইমোশনাল ডোনার’ বা নিঃস্বার্থবাদী দাতার কাছ থেকেও অঙ্গ নেওয়ার আইনি সুযোগ তৈরি হয়েছে। ‘মানবদেহে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন-২০২৬’–এ এ সুযোগ রাখা হয়েছে।

এর ফলে কিডনি ও লিভারের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ প্রতিস্থাপনে দেশে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। চিকিৎসক ও আইনজীবীরা মনে করছেন, এর ফলে রোগীদের বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা কমবে এবং চিকিৎসার খরচও সাশ্রয় হবে।

নতুন আইন অনুযায়ী, সরকারের অনুমোদন ছাড়া কোনো হাসপাতাল মানবদেহে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন করতে পারবে না। নির্দিষ্ট অনুমোদিত হাসপাতালেই এ ধরনের চিকিৎসা করা যাবে।

কারা অঙ্গ দান করতে পারবেন

আইন অনুযায়ী, সুস্থ ও স্বাভাবিক বুদ্ধিসম্পন্ন কোনো জীবিত ব্যক্তি নিজের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কা না থাকলে নিকটাত্মীয়ের শরীরে প্রতিস্থাপনের জন্য অঙ্গ দান করতে পারবেন।

একই শর্তে ‘ইমোশনাল ডোনার’ বা নিঃস্বার্থবাদী দাতাও নিকটাত্মীয় নন—এমন কাউকে অঙ্গ দিতে পারবেন। তবে চক্ষু, চর্ম, টিস্যু ও অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে নিকটাত্মীয় বা নিঃস্বার্থবাদী দাতা হওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই।

নিঃস্বার্থবাদী দাতা নির্ধারণ ও অনুমতি প্রদান কমিটির সভাপতি এবং বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) উপউপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. মুজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, নতুন আইন দেশে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে ‘নতুন দ্বার’ খুলেছে।

তিনি বলেন, আইনে ইমোশনাল ডোনারের সুযোগ যুক্ত হওয়ায় নিকটাত্মীয়ের বাইরে থেকেও অঙ্গদানের আইনি পথ তৈরি হয়েছে। আইনটির যথাযথ প্রয়োগ হলে দেশে কিডনি ও লিভার প্রতিস্থাপনের সংখ্যা বাড়বে এবং এ ধরনের চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা কমবে।

অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, আইন হওয়ার পর ইমোশনাল ডোনার হওয়ার জন্য অনেকে আবেদন করছেন। গত ১০ আগস্ট বিএমইউতে প্রথমবারের মতো ইমোশনাল ডোনারের কাছ থেকে পাওয়া কিডনি সফলভাবে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।

দেশে চিকিৎসা হলে কমবে খরচ

বিএমইউতে সরকারি অনুদানের অর্থে ছয়টি লিভার প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয়েছে জানিয়ে অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, একটি লিভার প্রতিস্থাপনের জন্য প্রায় ১৫০ ব্যাগের মতো রক্তের প্রয়োজন হতে পারে। এ চিকিৎসায় প্রায় ৩০ লাখ টাকা খরচ হতে পারে।

তার ভাষ্য, দেশে এই চিকিৎসার সুযোগ থাকলে রোগীদের বিদেশ যাওয়ার প্রয়োজন কমে আসবে। কারণ বিদেশে চিকিৎসার পাশাপাশি হোটেল, যাতায়াত ও অন্যান্য খরচও যুক্ত হয়।

তিনি বলেন, দেশে ভালো চিকিৎসাসেবা ও মানুষের আস্থা তৈরি করা গেলে কিডনি ও লিভার প্রতিস্থাপনের জন্য বিদেশমুখিতা অবশ্যই কমবে। এতে রোগীদের চিকিৎসা ব্যয়ও সাশ্রয় হবে।

ব্রেইন ডেথ ঘোষণায় নতুন নিয়ম

নতুন আইনে ব্রেইন ডেথ ঘোষণার বিষয়েও বিস্তারিত বিধান রাখা হয়েছে। কোনো ব্যক্তিকে ব্রেইন ডেথ ঘোষণার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্তে তাঁকে অন্তত ১২ ঘণ্টা সুস্পষ্ট কারণে অবিরাম কোমায় থাকতে হবে।

২ থেকে ১৩ বছর বয়সী শিশুর ব্রেইন ডেথ ঘোষণার ক্ষেত্রে ইলেক্ট্রোএনসেফালোগ্রাম (ইইজি) পরীক্ষার মাধ্যমে অন্তত ১২ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণের বিধান রাখা হয়েছে।

মেডিসিন, ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন, নিউরোলজি ও অ্যানেসথেশিওলজি বিষয়ের বিশেষজ্ঞ অন্তত তিনজন চিকিৎসকের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি ব্রেইন ডেথ ঘোষণা করতে পারবে। তবে এই কমিটির কোনো চিকিৎসক বা তাঁর নিকটাত্মীয় অঙ্গ প্রতিস্থাপন বা সংযোজনের সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত থাকতে পারবেন না।

কখন অঙ্গ সংগ্রহ করা যাবে

কোনো ব্যক্তি জীবদ্দশায় স্বেচ্ছায় অঙ্গ দান করে গেলে তাঁর অঙ্গ সংগ্রহ করা যাবে। এ ছাড়া ব্রেইন ডেথ ঘোষিত ব্যক্তির আইনানুগ উত্তরাধিকারী লিখিত অনুমতি দিলে অঙ্গ সংগ্রহ করা যাবে।

ব্রেইন ডেথ ঘোষণার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কোনো দাবিদার না থাকলেও নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি নিয়ে অঙ্গ সংগ্রহের সুযোগ রাখা হয়েছে আইনে।

দাতা ও গ্রহীতার বয়স

ব্রেইন ডেথ ঘোষিত ব্যক্তির ক্যাডাভেরিক অঙ্গ সংগ্রহের ক্ষেত্রে দাতার বয়স ২ থেকে ৭০ বছর হতে হবে। জীবিত দাতার বয়স হতে হবে ১৮ থেকে ৬৫ বছরের মধ্যে। তবে বিশেষ প্রয়োজনে অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে বয়সসীমা শিথিল করা যাবে।

গ্রহীতার বয়সও সাধারণভাবে ২ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে হতে হবে। তবে ১৫ থেকে ৫০ বছর বয়সীরা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ গ্রহণের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন। কর্ণিয়া, চর্ম ও টিস্যু প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে এ বিধান প্রযোজ্য নয়।

ইমোশনাল ডোনার হতে যেসব শর্ত

ইমোশনাল ডোনার হতে হলে একজন ব্যক্তির বয়স ১৮ বছরের বেশি হতে হবে। তাঁকে মানসিকভাবে সুস্থ এবং সজ্ঞানে সম্মতি দেওয়ার সক্ষমতা থাকতে হবে। কোনো আর্থিক প্রলোভন বা চাপ ছাড়াই স্বেচ্ছায় অঙ্গদানে আগ্রহী হতে হবে।

এ ছাড়া তিনি গ্রহীতার নিকটাত্মীয় না হলেও দীর্ঘদিনের পরিচিত হলে ইমোশনাল ডোনার হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে নিঃস্বার্থবাদী দাতা নির্ধারণ ও অনুমতি প্রদান কমিটির সুপারিশ লাগবে।

মাদকাসক্ত ব্যক্তি, আর্থিক প্রলোভনে অঙ্গ দিতে আগ্রহী ব্যক্তি বা সাধারণ অঙ্গদাতা হিসেবে অনুপযুক্ত কোনো রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি ইমোশনাল ডোনার হতে পারবেন না।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম বলেন, আগে আইনে দাতার সংজ্ঞা সংকীর্ণ হওয়ায় মূলত নিকটাত্মীয়দের মধ্যেই অঙ্গদানের সুযোগ সীমিত ছিল। এ কারণে নিকটাত্মীয় না থাকা অনেক রোগী দাতা না পেয়ে বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হতেন।

ইমোশনাল ডোনেশনের সুযোগ চেয়ে করা রিটের বিষয়ে তিনি বলেন, হাইকোর্ট যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে ইমোশনাল ডোনারের অঙ্গদানের সুযোগ দেওয়ার কথা বলেছিলেন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছিল। সেই রায়ের আলোকে এখন নতুন আইন হয়েছে।

ব্যারিস্টার রাশনা ইমামের মতে, নতুন আইনের যথাযথ প্রয়োগ হলে দেশে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দানের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে এবং রোগীদের বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা কমবে।

অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেনাবেচা নিষিদ্ধ

আইনের ১৮ ধারায় মানবদেহের কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেনাবেচা, এর বিনিময়ে কোনো সুবিধা নেওয়া, বিজ্ঞাপন দেওয়া বা এ বিষয়ে প্রচারণা চালানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

অপরাধে শাস্তি

আইন অনুযায়ী, নিকটাত্মীয়তার বিষয়ে মিথ্যা তথ্য দেওয়া, কাউকে এমন তথ্য দিতে উৎসাহিত বা প্ররোচিত করা কিংবা ভয় দেখানো অপরাধ। এ অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছর সশ্রম কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।

আইনের অন্য কোনো বিধান লঙ্ঘন বা লঙ্ঘনে সহায়তা করলে সর্বোচ্চ তিন বছর সশ্রম কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।

কোনো চিকিৎসক এ আইনের অধীনে অপরাধে দণ্ডিত হলে বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিলের দেওয়া তাঁর নিবন্ধন বাতিল হবে।

কোনো হাসপাতালে এ আইনের অধীনে অপরাধ সংঘটিত হলে হাসপাতালটির অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজনের অনুমতি বাতিল করা যাবে। সংশ্লিষ্ট অপরাধে অর্থদণ্ডের পাশাপাশি হাসপাতালের লাইসেন্সও স্থগিত করতে পারবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ।

নতুন আইনে ইমোশনাল ডোনারের সুযোগ তৈরি হওয়ায় কিডনি ও লিভারের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ প্রতিস্থাপনে দেশের সক্ষমতা বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের আশা, চিকিৎসার সুযোগ ও মানুষের আস্থা বাড়লে একদিকে যেমন বিদেশমুখিতা কমবে, অন্যদিকে তেমনি রোগীদের চিকিৎসা ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।

আরএস-রাসেল

০ মন্তব্য


No comments yet. Be the first to comment!